দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রপ্তানি খাতে। শীর্ষ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা ধীরে ধীরে তাঁদের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছেন। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে অর্ডার সরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী নেতারা এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বিশেষ করে আগামী জুলাই-আগস্ট মৌসুমের অর্ডার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক বিদেশি ক্রেতা ইতোমধ্যে বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছেন। এতে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আলোচনায় আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, “গত এক সপ্তাহে অন্তত চারজন বড় ক্রেতা আমাকে জানিয়েছেন—তোমাদের দেশে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনিশ্চিত। এ কারণে তাঁদের টপ ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশে নতুন অর্ডার দিতে নিরুৎসাহিত করছে।” তিনি আরও জানান, এভাবে চলতে থাকলে বহু কষ্টে অর্জিত রপ্তানি বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।
এদিকে, গাজীপুর চেম্বার-এর পরিচালক মুস্তাজিরুল ইসলাম শোভন রপ্তানি খাত টিকিয়ে রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সোলার প্যানেলসহ গ্রিন এনার্জি সরঞ্জাম আমদানিতে নীতিগত সহায়তা ও কর ছাড় দেওয়া হলে শিল্প খাত কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
অন্যদিকে, ঢাকা চেম্বার উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেয়। তাঁদের মতে, এতে সাধারণ করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের রপ্তানি আয় টানা আট মাস ধরে নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে মোট রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি কমে যাওয়াকে সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের এসব উদ্বেগের জবাবে আবদুর রহমান খান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে করপোরেট কর কমানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পায়।
তিনি আরও জানান, করদাতাদের সুবিধার্থে ট্যাক্স রিফান্ড প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অটোমেশন করা হচ্ছে। এর ফলে রিফান্ড সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে করদাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে এবং মাঝখানে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা থাকবে না। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে করপোরেট ট্যাক্স রিটার্ন শতভাগ অনলাইনে জমা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, জ্বালানি সংকট, রপ্তানি হ্রাস এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত একটি কঠিন সময় পার করছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়