ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক প্রার্থীর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘নমনীয়তা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে অসহিষ্ণুতা ও সহিংস প্রবণতা উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬: সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতকরণে অংশীজনের ভূমিকা’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশের সাতটি বিভাগ ও বিভিন্ন জেলায় নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর তিনি এসব পর্যবেক্ষণে পৌঁছেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনকে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, অন্যথায় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একজন কমিশনারের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়—একজন ঋণখেলাপি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র অনুকম্পার ভিত্তিতে বৈধ করা হয়েছে। এ ধরনের আচরণ কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। ভবিষ্যতেও যদি এমন আচরণ চলতে থাকে, তাহলে দেশের জন্য তা গভীর সংকট ডেকে আনবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করে এবং অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে এবারের নির্বাচনও বিতর্কিত হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সরকার ও নির্বাচন কমিশন—সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অপপ্রচারের ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন কোনো প্রার্থীর মৃত্যু বা প্রার্থিতা প্রত্যাহারের মতো ভুয়া তথ্য এআইয়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হতে পারে। এতে নির্বাচন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পোস্টাল ব্যালট নিয়েও বিতর্কের সুযোগ আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, প্রার্থীদের আয় ও সম্পদের তথ্য দেখে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে—অনেক প্রার্থী তথ্য গোপন করেছেন। প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচন কমিশন কি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় হলফনামার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করেছে? প্রভাবশালী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কমিশন কি নমনীয় ছিল? এসব প্রশ্নের সামান্য সত্যতাও নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ভোটাধিকার প্রয়োগকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অর্থ, প্রলোভন বা অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে ভোট দেওয়া যাবে না। সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে এবং দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মানবতাবিরোধী, মাদক কারবারি ও অসৎ ব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে যেকোনোভাবে জয়লাভের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী দলীয় প্রতীক বাধ্যতামূলক হওয়ায় এক দল থেকে অন্য দলে যোগ দিয়ে মনোনয়ন নেওয়ার ঘটনা ঘটছে, এতে ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের নেতারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
দলীয় মনোনয়নে তৃণমূলের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী তৃণমূলের ভোটে প্রার্থী প্যানেল তৈরির বিধান থাকলেও কোনো দল তা অনুসরণ করেনি। এটি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
নির্বাচনী ব্যয় মনিটরিং কমিটি গঠন এবং অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়া বন্ধের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায়ও উদ্বেগ জানানো হয়।
নারী প্রার্থী মনোনয়ন প্রসঙ্গে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে মনোনীত নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার ভঙ্গের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়