1. info@www.media71bd.com : NEWS TV : NEWS TV
  2. info@www.media71bd.com : TV :
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩১ অপরাহ্ন

রানীনগরে মসজিদভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ—কাগজে কেন্দ্র, বাস্তবে নেই কার্যক্রম

রিফাত হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি
  • Update Time : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

নওগাঁর রানীনগর উপজেলা-তে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে একাধিক শিক্ষাকেন্দ্র চালু থাকলেও বাস্তবে অনেক কেন্দ্রের অস্তিত্ব নেই বা কার্যক্রম বন্ধ—এমন চিত্র উঠে এসেছে সরেজমিন পরিদর্শনে।

উপজেলার লোহাচুড়া পশ্চিম পাড়া কাচারী কেন্দ্রের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মোছা. কাজল রেখা। তবে নির্ধারিত কেন্দ্রে না গিয়ে তিনি নিজের বাড়িতেই পাঠদান করছেন। বাড়ির নিচতলায় হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনের মাঝেই চলছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ক্লাস। নিয়ম অনুযায়ী যেখানে ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা, সেখানে দেখা গেছে মাত্র ৭-৮ জন শিশুকে নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, কালিগ্রাম ইউনিয়নের আমগ্রাম জামে মসজিদ কেন্দ্রের শিক্ষক মোছা. নুসরাত জাহান সূচির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার নামে দেখানো কেন্দ্রটিতে বর্তমানে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম নেই। এমনকি তার বর্তমান কর্মস্থল হিসেবে দেখানো আসমাইল হাজির কাচারী কেন্দ্রটিও গত তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত সমন্বয় সভায় উপস্থিত না থেকেও দীর্ঘদিন ধরে বেতন উত্তোলন করে আসছেন।

এই দুই শিক্ষকের সঙ্গে উপজেলা ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নুসরাত জাহান সূচি তার স্ত্রী এবং কাজল রেখা তার শাশুড়ি। ফলে নিয়োগ ও তদারকিতে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও সামনে এসেছে।

সরেজমিনে বড়গাছা ইউনিয়নের মালশন বড়পুকুরিয়া বাজার জামে মসজিদ, কালিগ্রাম ইউনিয়নের জয়সার জামে মসজিদ এবং টংকুড়ি এলাকার কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায় হতাশাজনক চিত্র। যেখানে ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, সেখানে উপস্থিতি ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৬ জন। অনেক কেন্দ্রে অবকাঠামোগত সুবিধার ঘাটতি স্পষ্ট, কোথাও মাটির ঘরের বারান্দায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পাঠদান চলছে।

কিছু কেন্দ্রে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে কেন্দ্র চালু থাকলেও বাস্তবে কোনো কার্যক্রম নেই। কোথাও অস্থায়ীভাবে শিক্ষার্থী এনে উপস্থিতি দেখানো হয়, আবার কোথাও ইচ্ছেমতো কেন্দ্র পরিবর্তন করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফলে পুরো প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আমগ্রাম জামে মসজিদ কেন্দ্রে তিন বছর আগেও নিয়মিত ক্লাস হতো। কিন্তু বর্তমানে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই। একইভাবে আসমাইল হাজির কাচারী কেন্দ্রের একজন অভিভাবক জানান, হঠাৎ করেই শিক্ষকের আসা বন্ধ হয়ে যায় এবং এরপর থেকে কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক নুসরাত জাহান সূচির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, কাজল রেখা দাবি করেন, সাময়িক কারণে তিনি নিজের বাড়িতে ক্লাস নিচ্ছেন এবং নিয়মিত শিক্ষার্থী উপস্থিতি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিগগিরই অন্য স্থানে কেন্দ্র স্থানান্তর করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, যথাযথ তদারকির অভাবে ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসার অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতা দিন দিন বাড়ছে। তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রকল্পটি কার্যত ব্যর্থতার মুখে পড়েছে এবং গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা পর্যায়ের সচেতন মহল দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে প্রকল্পটির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসা ফোনে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং সরাসরি অফিসে এসে কথা বলার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, নওগাঁ জেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মো. মারুফ রায়হান বলেন, কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, সাময়িকভাবে বাড়ির পাশে নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্র চালানো গেলেও বসতঘরের ভেতরে ক্লাস নেওয়ার নিয়ম নেই।

রানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী না থাকায় কেন্দ্র পরিবর্তন করতে হয়েছে। তিনি জানান, আগে ৮৯টি কেন্দ্র থাকলেও যাচাই-বাছাই শেষে বর্তমানে ৭৪টি কেন্দ্র চালু রয়েছে। সব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

সব মিলিয়ে, মসজিদভিত্তিক এই শিক্ষা কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকল্পটির উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

More News Of This Category

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়

ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট
error: Content is protected !!