বর্তমানে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশজুড়ে চলমান এই পরিস্থিতি আসন্ন পহেলা বৈশাখের উৎসব ও ব্যাপক জনসমাগমের কারণে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম বা ‘মিজেলস’ একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস, হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে সহজেই এটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ার আগে ও পরে মিলিয়ে প্রায় ৭ থেকে ৯ দিন পর্যন্ত একজন আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
রোগের লক্ষণ হিসেবে শুরুতে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়া দেখা যায়। জ্বরের কয়েক দিন পর মুখ ও শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেয়। ভাইরাসটি শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়।
Directorate General of Health Services-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৫৩ জন। একই সময়ে নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৬৩৯ জন।
এই সময়ে নিশ্চিত হামে ২৮ জনের মৃত্যু এবং সন্দেহজনক হামে আরও ১৫১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ১০ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং প্রায় ৭ হাজার ৬৫৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। অর্থাৎ এক মাসেরও কম সময়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১৮৯ জনের। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
এত অল্প সময়ে এত বড় আকারে সংক্রমণকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যেই আগামী ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দেশজুড়ে বড় আকারের উৎসব আয়োজন রয়েছে, যেখানে ব্যাপক জনসমাগম হবে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, “একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে ১৬ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই জনসমাগমে অসুস্থ কেউ গেলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ থাকলে উৎসবে যাওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে যারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেবা দেন, তাদেরও বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা দরকার। শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাযুক্ত শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন তিনি।
Institute of Epidemiology Disease Control and Research-এর সাবেক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হামে আক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত শিশুদের কোনোভাবেই জনসমাগমে নেওয়া উচিত নয়। বৈশাখের মতো উৎসবে ভিড় বেশি থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, ছোট শিশুরা মাস্ক দীর্ঘ সময় ব্যবহার করতে পারে না, তাই তাদের ভিড় থেকে দূরে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল সতর্ক করে বলেন, জ্বর বা শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়া শিশুদের আলাদা রাখতে হবে এবং কোনোভাবেই মেলায় নেওয়া যাবে না। কারণ লক্ষণ প্রকাশের আগের কয়েক দিনেও রোগটি ছড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত দ্রুত সংক্রমণশীল বায়ুবাহিত রোগ। তাই বড় উৎসব ও জনসমাগমে সতর্কতা না মানলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব ও আসন্ন বৈশাখী উৎসব একসঙ্গে মিলিয়ে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অসুস্থ অবস্থায় জনসমাগম এড়িয়ে চলাকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়