২০০৭ সালের বহুল আলোচিত ওয়ান ইলেভেন নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহমেদ-এর সাবেক প্রেস সচিব ও উপদেষ্টা এম মুখলেসুর রহমান চৌধুরী।
সম্প্রতি দেশে ফিরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ওই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা জারি এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের পেছনে সামরিক ও রাজনৈতিক নানা সমঝোতা কাজ করেছে।
মুখলেসুর রহমান বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সংসদ বর্জন, আন্দোলন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার এবং ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সহিংসতা— এসব ঘটনাকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়।
তার দাবি, এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ জরুরি অবস্থা জারির পরিবেশ তৈরি করেন।
তিনি জানান, ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর রাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
মুখলেসুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তখন জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করে সেনাবাহিনীকে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ হিসেবে মোতায়েনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ এতে সম্মত হননি।
ওয়ান ইলেভেনের দিনের বর্ণনায় তিনি বলেন, সেদিন সকালে তিন বাহিনীর প্রধান বঙ্গভবনে যান। সেখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন বাতিল হতে পারে— এমন আশঙ্কার কথা বলে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
তার অভিযোগ, পরে সেনাসদস্যরা বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে জোরপূর্বক একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
মুখলেসুর রহমান দাবি করেন, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রথমে মুহাম্মদ ইউনূস-এর নাম আলোচনায় আসে। তবে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বের বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় পরে ফখরুদ্দিন আহমেদ-কে প্রধান উপদেষ্টা করা হয়।
সাক্ষাৎকারে তিনি আরও অভিযোগ করেন, দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছিল।
তার দাবি অনুযায়ী, সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার কাছে এমন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল যাতে ভবিষ্যতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। তবে বিএনপি নেত্রী তা প্রত্যাখ্যান করেন বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে শেখ হাসিনা নির্বাচনের জন্য ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সমঝোতায় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন মুখলেসুর রহমান।
সাক্ষাৎকারে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি-এর ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরিতে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের সম্পৃক্ততা ছিল এবং মঈন ইউ আহমেদের ‘সেফ এক্সিট’ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
মুখলেসুর রহমানের অভিযোগ, ওই সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কিছু সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে বিভাজন তৈরি এবং সংস্কারপন্থি গ্রুপ গঠনেরও চেষ্টা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী সময় থেকেই দেশে গুম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সংস্কৃতি শক্তিশালী হতে শুরু করে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়