1. info@www.media71bd.com : NEWS TV : NEWS TV
  2. info@www.media71bd.com : TV :
সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৬:৪৩ অপরাহ্ন

শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ: বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতানের উত্থান ও বিস্তার

ইসলামিক ডেস্ক
  • Update Time : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

দিল্লি সালতানাতের শাসনামলে, মুহাম্মদ বিন তুঘলক-এর রাজত্বে এক তরুণের উত্থান পরবর্তীতে বদলে দেয় বাংলার ইতিহাস। সেই তরুণই পরে পরিচিত হন শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ নামে—বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান হিসেবে।

শুরুটা ছিল সাধারণ। আলি মুবারক নামের এক বিশ্বস্ত কর্মচারীর সুপারিশে ইলিয়াস রাজদরবারে চাকরি পান। আলি মুবারকের প্রভাবশালী প্রভু ছিলেন ফিরোজ শাহ তুঘলক (তৎকালীন ক্ষমতাকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি)। কিন্তু ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় যখন ইলিয়াস এক ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং বিপদের আশঙ্কায় দিল্লি ত্যাগ করেন।

পরে বাংলার লখনৌতিতে এসে নতুনভাবে জীবন শুরু করেন তিনি। আলি মুবারকের সহায়তায় আবারও সামরিক জীবনে প্রবেশ করেন। নিজের মেধা, বুদ্ধি ও কৌশলে অল্প সময়েই সেনাপতি পদে উন্নীত হন।

লখনৌতির প্রশাসনিক অস্থিরতা ইলিয়াসের জন্য সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। একের পর এক সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেন। অবশেষে ১৩৪২ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী আলাউদ্দিন আলি শাহকে পরাজিত করে নিজেকে স্বাধীন শাসক ঘোষণা করেন এবং ‘শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন।

ক্ষমতায় এসে তিনি প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। পূর্বের মতো শুধু মুসলিমদের ওপর নির্ভর না করে হিন্দুদেরও প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন। বাঙালি পদাতিক সৈন্য ও নৌবাহিনী গড়ে তুলে সামরিক শক্তিকে নতুন রূপ দেন।

এরপর শুরু হয় তার সাম্রাজ্য বিস্তার। উড়িষ্যা অভিযানে তিনি জয়পুর, কটক ও চিল্কা হ্রদ পর্যন্ত অগ্রসর হন। এই অভিযানের মাধ্যমে বাংলার রাজনৈতিক প্রভাব প্রথমবারের মতো উড়িষ্যার দিকে বিস্তৃত হয়।

১৩৫০ সালে তিনি নেপাল অভিযান পরিচালনা করেন। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে নেপালি বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং কাঠমান্ডু পর্যন্ত পৌঁছান। যদিও দীর্ঘমেয়াদে ওই অঞ্চল দখলে রাখা সম্ভব হয়নি, তবুও তার সামরিক দক্ষতার প্রমাণ মেলে এই অভিযানে।

এদিকে দিল্লির ক্ষমতার পরিবর্তন তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফিরোজ শাহ তুঘলক সিংহাসনে বসার পর পুরনো বিরোধ মাথাচাড়া দেয়। ইলিয়াস শাহ দিল্লির দিকে অগ্রসর হয়ে বিহার ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করেন। তবে সরাসরি দিল্লি আক্রমণ থেকে বিরত থাকেন কৌশলগত কারণে।

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল—লখনৌতি, পাণ্ডুয়া, সপ্তগ্রাম ও সুবর্ণগ্রাম—একত্র করে তিনি পুরো অঞ্চলকে “বাঙ্গালা” নামে অভিহিত করেন এবং নিজেকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গাল’ ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলার রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে।

১৩৫৩ সালে ফিরোজ শাহ বাংলায় আক্রমণ চালালে ইলিয়াস শাহ একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন। দীর্ঘ অবরোধের পরও দিল্লির বাহিনী দুর্গ ভেদ করতে ব্যর্থ হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া ও সরবরাহ সংকটের কারণে ফিরোজ শাহকে পিছু হটতে হয়।

ইলিয়াস শাহ শুধু যোদ্ধা নন, ছিলেন দূরদর্শী শাসকও। সুফি সাধকদের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ছিল এবং তিনি বিভিন্ন মসজিদ ও খানকাহ নির্মাণ করেন। একই সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখেন।

বাংলাকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চলকে এক শাসনের অধীনে এনে তিনি বাঙালির জন্য আলাদা পরিচয়ের ভিত্তি তৈরি করেন।

১৩৫৮ সালে তার মৃত্যু হয়। এরপর তার পুত্র সিকান্দর শাহ সিংহাসনে বসেন এবং তার গড়া সাম্রাজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।

More News Of This Category

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়

ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট
error: Content is protected !!